Showing posts with label সন্তানকে স্তন্যদানের উপকারিতা. Show all posts
Showing posts with label সন্তানকে স্তন্যদানের উপকারিতা. Show all posts

সন্তানকে স্তন্যদানের উপকারিতা

অর্কাইভ্স অফ জেনারেল সাইকিয়াট্রির ২০০৮-এর মে সংখ্যায় ক্যানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির মাইকেল ক্রেমার ও তাঁর সহকর্মীরা একটি গবেষণা পত্রে বলেছেন যে, শিশুরা জন্মাবার পর থেকে তিন মাস বা তার অধিক সময়ে শুধু মায়ের দুধ খেয়ে বড় হলে, বেশি বুদ্ধিমান হয়। ৬ বছর বয়সে এইসব শিশুদের আই.কিউ (I.Q.*) বা বুদ্ধ্যাঙ্ক মেপে দেখা গিয়েছে যে, তারা অন্য শিশুদের থেকে ৬ পয়েণ্ট এগিয়ে আছে। এর আগেও এ ব্যাপারে কিছু কিছু অনুসন্ধান হয়েছে, তবে এতটা ব্যাপক ভাবে কোনও সমীক্ষা আগে করা হয় নি। মোটামুটি ভাবে আগেও মনে করা হত যে যারা শিশু অবস্থায় শুধু মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে তাদের চিন্তাশক্তির ক্ষমতা, শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, ইত্যাদি ফর্মুলা খেয়ে বড় হওয়া শিশুদের থেকে একটু বেশি।

কেন শুধু মায়ের স্তন্যপান করে বড় হলে চিন্তাশক্তি বাড়ে তার কারণ কিন্তু পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় নি। এর কারণ মায়ের দুধের কোনও বিশেষ অনুপানের জন্য না স্তন্যপান কালে মায়ের সান্নিধ্য শিশুর চিন্তাশক্তিকে উদ্দীপ্ত করছে - সে নিয়ে এখনও বিতর্ক আছে। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করেন মায়ের দুধের কিছু পুষ্টিকারক বস্তু, যেমন কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড, বাজারে কেনা ফর্মুলায় থাকে না। এই অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ডোকোসাহেক্সানোইক অ্যাসিড আছে - যেগুলো শিশুর মস্তিষ্ক-বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আমেরিকার শিশু-বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা অবশ্য নতুন মায়েদের স্তন্যদান করতে পরামর্শ দেন অন্য কারণে। মায়ের দুধ খেলে বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং তাদের দেহের প্রতিরোধশক্তি বর্ধিত হয়। যেসব শিশু মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়, তাদের কানের অসুখ, পেটের অসুখ, অ্যালার্জি, ইত্যাদি বোতলে ফর্মুলা খাওয়া বাচ্চাদের থেকে কম হয়।

প্রসঙ্গতঃ সন্তান জন্মের কিছু আগে থেকেই নারীদের স্তনে দুধ সৃষ্টি হয়। প্রথম দিকের দুধকে কলোস্ট্রাম বলা হয়; পরে একটি অন্তর্বর্তী অবস্থার মধ্যে দিয়ে দুধটি একটি স্থায়ী প্রকৃতি নেয়। কলোস্ট্রাম শিশু জন্মাবার পর কয়েকদিন মাত্র থাকে। এটি দেখতে হলুদ এবং মাখনের মতো। এমনি দুধের থেকে অনেক ঘন। এটিতে প্রচুর পরিমানে প্রোটিন, ফ্যাটে দ্রবনীয় ভিটামিন, খনিজ এবং ইম্যুনোগ্লোবিন থাকে। ইম্যুনোগ্লোবিন হল অ্যাণ্টিবডি যেটা মা-র দেহ থেকে শিশু সন্তানদের মধ্যে যায় এবং শিশুকে নানান ভাইরাস ও বিজানুঘটিত রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধশক্তি দেয়। নতুন মায়েরা অনেক সময়ে এটি আসল দুধ নয় বলে সন্তানকে না দিয়ে ফেলে দেন, যেটা একেবারেই অনুচিত। সন্তানজন্মের দুচারদিন বাদে কলোস্ট্রাম তৈরি বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্তর্বর্তীকালীন দুধের সৃষ্টি হয়। এটি সপ্তাহ দুয়েক থাকে। এই দুধে স্নেহপদার্থ, ল্যাকটোজ, জলে দ্রবনীয় ভিটামিন এবং কলোস্ট্রামের থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্যালোরি থাকে। সপ্তাহদুয়েক পরে মাতৃস্তন্য তার স্থায়ী পরিণত অবস্থায় পৌঁছায়। পরিণত দুধের ৯০ শতাংশ হল জল। শিশুর জলের প্রয়োজন এই দুধ মেটায়। অন্য ১০ শতাংশ হল কার্বো-হাইড্রেট, প্রোটিন এবং স্নেহ পদার্থ।

ক্রেমার ও তাঁর সহযোগীরা তাঁদের গবেষণা করেছেন পূর্ব-ইউরোপের বেলারুস-এর মা ও শিশুদের নিয়ে। মোট ৭,১০৮ জন শিশু যদৃচ্ছাক্রমে বেছে (random sampling) তাদের তিনমাস ধরে শুধু মায়ের দুধ খেতে দেওয়া হয়েছিল। আর এদের সঙ্গে তুলনা করার জন্য আরও ৬,৭৮১টি শিশুকে মায়ের দুধের সঙ্গে অন্যান্য বিকল্প খাবার বা ফর্মুলা দেওয়া হয়েছিল।

এই শিশুদের বয়স যখন ৬.৫ বছর হয়, তখন এদের বুদ্ধি পরীক্ষা করে হয়। দেখা যায় যেসব শিশুরা শুধু মায়ের দুধ খেয়েছে তাদের মোট বুদ্ধ্যাঙ্ক গড়ে অন্যদের থেকে ৫.৯ পয়েণ্ট বেশি। এরমধ্যে তাদের verbal intelligence ** বা বাচনিক বুদ্ধি ৭.৫ পয়েণ্ট বেশি, non-verbal*** বা অবাচনিক বুদ্ধি ২.৯ পয়েণ্ট বেশি। এছাড়া এদের শিক্ষকদের মতে যারা শিশু অবস্থায় শুধু মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে তারা অন্য শিশুদের তুলনায় পড়াশুনোয় ভালো (পড়া ও লেখা দুক্ষেত্রেই)। এই গবেষণার ফলাফল দেখে ক্রেমার ও তাঁর সহযোগীরা নতুন মায়েদের পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁদের শিশুদের অন্ততঃ তিনমাস শুধু স্তনদান করে বড় করতে - পারলে ছয়মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত স্তনদান করতে।

মায়ের দুধের এতো উপকারিতা সত্বেও এই দুধের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ফর্মুলার প্রস্তুতকারকদের (বিশেষ করে ণএসতলস্ত-র) মার্কেটিং-এর দৌলতে শিশুদের মাতৃস্তন দিয়ে বড় করার স্বাভাবিক ব্যবস্থা দ্রুত গতিতে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। প্রথমদিকে এগুলিকে ফর্মুলাকে শিশুদের পক্ষে আদর্শ বলে বিক্রি করা হত। হাসপাতালে এগুলিকে বিলিয়ে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, স্বাস্থ্যকর্মীদের সাহায্যে এগুলিকে বিক্রি করা হত। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যেখানে অনেক মায়েই অপুষ্টিতে ভুগছে, যার প্রভাব তাদের বুকের দুধেও থাকবে, সেখানে এই ধরণের আদর্শ বিকল্পের নিশ্চয় একটা আকর্ষণ ছিল। কিন্তু পরিস্রুত জলের অভাবে গুঁড়ো ফর্মুলা মিশিয়ে দুধের এই বিকল্প বহু শিশুর স্বাস্থ্যহানির কারণ হয়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে WHO (ওযার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন) এবং UNICEF (ইউনাইটেড নেশন্স ইণ্টারন্যাশেনাল চিল্ড্রেন্স এমার্জেন্সি ফাণ্ড) ইউনাইটেড ষ্টেটস এজেন্সি ফর ইণ্টারন্যাশেনাল ডেভালপমেণ্ট এবং সুইডিশ ইণ্টারন্যাশেনাল ডেভালপেমণ্ট অথরিটির সঙ্গে একযোগে একটি ঘোষণা (Innocenti Declaration) জারি করেন। এতে বলা হয় মায়েদের স্তন্যদান একটি অদ্বিতীয় পদ্ধতি যেটি শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায় এবং অসুখবিশুখ এড়িয়ে তাদের সুস্থ ভাবে বড় হতে সাহায্য করে। এছাড়া, স্তন্যদান মায়েদের স্তন এবং ওভারিয়ান ক্যানসারের হবার সম্ভাবনা কমায়; পরপর দুটি গর্ভধারণের অন্তর্বর্তীকাল বৃদ্ধি করে; সামাজিক এবং আর্থিক দিক থেকে এটি বাঞ্ছনীয়। এই উপকারিতাগুলো বৃদ্ধি পায় যদি জন্মের ছয়মাস পর্যন্ত শিশুদের শুধু মায়ের দুধ খাইয়ে বড় করা হয়।

এই ঘোষণায় বিভিন্ন দেশকে স্তন্যদান করার সংস্কৃতিকে উৎসাহ দিতে অহবান জানানো হয়। মায়েরা যাতে বাধাহীন ভাবে সন্তানকে স্তন্যদান করতে পারেন তারজন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ বিশ্বের দেশগুলিকে সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে যেসব কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিচ্ছে তারা যাতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপনের উপর যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে - সেগুলি যেন মেনে চলা হয় - সেটা দেখতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞাতে বিকল্প ফর্মুলা প্রস্তুতকারকদের সোজাসুজি জনসাধারণকে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মারফতে তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া বা সেটির ফ্রি স্যাম্প্ল ইত্যাদি দেওয়া চলবে না বলা হয়েছে। তবে এখনও এই নিষেধাজ্ঞা বিকল্প দুধের প্রস্তুতকারকরা সব সময়ে মানছে না। তার প্রতিবাদে 'বয়কট' ও নানা আন্দোলনের কথা এখনও পত্রপত্রিকায় দেখা যায়।

Recent Posts

Popular Posts

Categories

Unordered List

Sample Text

Pages